হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়েই জন্ম নিয়েছিল আজকের পুরুলিয়া।

“শুন বিহারী ভাই, তোরা রাখতে লারবি ডাঙ্ দেখাই তোরা আপন তরে ভেদ বাড়ালি, বাংলা ভাষায় দিলি ছাই ভাইকে ভুলে করলি বড় বাংলা-বিহার বুদ্ধিটাই বাঙালী-বিহারী সবই এক ভারতের আপন ভাই বাঙালীকে মারলি তবু বিষ ছড়ালি — হিন্দী চাই বাংলা ভাষার পদবীতে ভাই কোন ভেদের কথা নাই।”

ভজহরি মাহাতোর লেখা এই টুসু গান গাইতে গাইতে হাওড়া ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে জনপ্লাবন। বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রতিবাদ করে, জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করে, মাতৃভাষা বাংলার দাবি নিয়ে মানভূমবাসীরা মিছিল করে এগিয়ে আসছেন কলকাতার দিকে। ২০ এপ্রিল পাকবিড়রা থেকে কলকাতার উদ্দেশে হাঁটা শুরু করেছিলেন সত্যাগ্রহীর দল। ১০০৫ জনের সেই দলে ছিলেন অসংখ্য মহিলাও। ৬ মে অবধি, টানা ২১ দিন, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তাঁরা এসে পৌঁছোলেন কলকাতায়।

মাতৃভাষার দাবিতে তাঁরা লড়ছেন। অথচ, ডালহৌসি স্কোয়ারে পা রাখতেই গ্রেপ্তার হলেন তাঁরা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরিশ্রমে অসুস্থও হয়ে পড়লেন অনেকে। কিন্তু তাঁদের এই ‘লং মার্চ’ ব্যর্থ হয়নি, ব্যর্থ হয়নি মানভূমবাসীর দীর্ঘ লড়াই। পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম ভাষা-আন্দোলন হিসেবে পরিচিত মানভূমের এই ভাষা আন্দোলনই। যার ফসলরূপে আজ থেকে ঠিক ৬৫ বছর আগে ১ নভেম্বর জন্ম নিয়েছিল পুরুলিয়া জেলা। জন্মের পর তা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। অথচ, মানভূমের বাংলাভাষাকে ঘিরে জন্ম নেওয়া সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের কথা ভুলতেই বসেছি আমরা।

লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করলেন। পূর্ববঙ্গ-উত্তরবঙ্গ-অসাম-ত্রিপুরা নিয়ে একটি ভাগ, অন্যভাগে বাংলার বাকি অংশের সঙ্গে জুড়ে গেল বিহার ও ওড়িশাও। এই দ্বিতীয়ভাগেই ছিল মানভূম। সেখানে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার আগে থেকেই। কিন্তু স্বাধীনতার পর তা চরম আকার নিল। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের কবলে বাংলা স্কুলগুলো বদলে যেতে লাগল হিন্দি স্কুলে। বাংলাভাষী-অধ্যুষিত মানভূমে সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক কাজে চেপে বসল হিন্দি। ঠিক যে-কায়দায় ‘পূর্ব পাকিস্তানে’ বাংলার ওপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, প্রায় একইভাবে মানভূমে বাংলার ওপরে হিন্দির আগ্রাসন বাড়তে শুরু করল। এবং এর বিরুদ্ধেই শুরু হল আন্দোলন।

১৯৪৮ সালের ৩০ এপ্রিল, মানভূম জেলা কংগ্রসের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের দাবি ছিল, ‘মানভূম বাংলা ভাষাভাষী’। কিন্তু সেই দাবি মান্যতা পায়নি কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে। প্রতিবাদে ১৪ জুন, পাকবিড়রায় কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন অসংখ্য কংগ্রেস-কর্মী। সেই দলে ছিলেন ভজহরি মাহাতো, অতুলচন্দ্র ঘোষ, অন্নদাপ্রসাদ চক্রবর্তী, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ, বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত সহ ৩৭ জন নেতা। গঠিত হল ‘লোকসেবক সঙ্ঘ’। তাঁরা বাংলাভাষার দাবিতে সত্যাগ্রহ শুরু করলেন।

কিন্তু, সেই সত্যাগ্রহের ওপরেও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নেমে এল। ঝালদা, পুরুলিয়া ও সাঁতুরির জনসভায় লাঠিচার্জ করে পুলিশ। অনেকে আহত হন। চিত্তভূষণ দাশগুপ্তের মাথা ফাটে, গ্রেপ্তার হন ৭ নেতা। নির্মম অত্যাচার শুরু হয় মহিলা নেত্রীদের ওপরেও। লাবণ্যপ্রভা দেবী, রেবতী ভট্টাচার্য, ভাবিনী মাহাতোর ওপরে অকথ্য নির্যাতন চলে। এত দমন-পীড়নেও অবশ্য আন্দোলন স্তিমিত হয়নি। উল্টে মানভূমের শিকড়ের গান টুসুকে আঁকড়ে শুরু হয় ‘টুসু সত্যাগ্রহ’। একটি ছোট্ট পুস্তিকা ‘টুসু গানে মানভূম’ নামে একটি পুস্তিকা আগুন জ্বালিয়ে দিল গোটা মানভূমে। টুসুকে ঘিরেই যেন নতুন জীবন পেল এই আন্দোলন। ভয়ে বিহার সরকার যূথবদ্ধভাবে টুসু গান নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। কিন্তু তাতেও ঠেকানো গেল না টুসু গানের ভিতর দিয়ে বাংলাভাষার প্রতি আবেগের স্ফুরণ। অসংখ্য মানুষ টুসু গাওয়ার জন্য গ্রেপ্তার হলেন।

ইতিমধ্যে, ১৯৫২ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে হইচই ফেলে দিয়েছেন ‘লোকসেবক সঙ্ঘে’র দুই প্রার্থী ভজহরি মাহাতো ও চৈতন মাঝি। বিধানসভাতেও জিতেছেন ভাষা আন্দোলনের সাত জন প্রার্থী। আন্দোলনের ঢেউ যখন আরো বাড়ছে, এমন সময়ে সীমা কমিশনের কাজ শুরু হল। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় এবং শ্রীকৃষ্ণ সিংহ প্রস্তাব দিলেন বাংলা-বিহার জুড়ে গিয়ে নতুন রাজ্য হোক। আগুনে যেন ঘৃতাহুতি পড়ল। মানভূমের আন্দোলন আরো জোরদার হল। পাশে দাঁড়ালেন কলকাতার বুদ্ধিজীবীরাও। ততদিনে মানভূমের ভাষা আন্দোলনে গ্রেপ্তারির সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল অতুলচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে শুরু হল কলকাতার উদ্দেশে পথযাত্রা। কণ্ঠে টুসুগানের পাশাপাশি ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গান।

কলকাতায় পা রাখার পরপরই গ্রেপ্তারি। তার ১২ দিন পরে মুক্তি। এই সময়ে, কলকাতাতেও মানভূমের সংহতিতে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রেপ্তার হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে একপ্রকার বাধ্য হয়েই রদ করা হল বাংলা-বিহার সংযুক্তির প্রস্তাব। দ্রুত পাশ হল বঙ্গ-বিহার ভূমি হস্তান্তর আইন। তারপর, সীমা কমিশনের রিপোর্টে সরকারি নানা স্তর টপকে জন্ম নিল পুরুলিয়া জেলা। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর। মানভূমবাসীরা এতদিন পরে অন্তর্ভুক্ত হলেন পশ্চিমবঙ্গে। এখানে কেউ আর বাংলাভাষায় পড়তে-লিখতে বাধা দেয় না।

সময়ের নিরিখে ইতিহাসের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন মানভূমের ভাষা আন্দোলন। বাংলাভাষাকে ঘিরে উত্তাল হয়েছে পূর্ববঙ্গ। জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। বরাক উপত্যকায় প্রাণ দিয়েছেন ১১ জন। এইসবই মাতৃভাষার অধিকারের জন্য। মানভূম সেই লড়াইয়ের এক উজ্জ্বল নাম। আজ যখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় নিজের ঘরেও কোণঠাসা হচ্ছে বাংলা ভাষা, তখন এই আন্দোলনের শিক্ষা যেন ডাক পাঠাচ্ছে নতুন করে। নিজের মাতৃভাষাকে ঘিরে নতুনভাবে বাঁচার ডাক, নিজের পরিচিতিসত্তাকে খুঁজে নেওয়ার ডাক। আমরা শুনতে পাচ্ছি তো?

সংগৃহীত।

error: Content is protected !!